কাতারে ফ্রি ভিসা প্রতারণার নিষ্ঠুর ফাঁদ

1376

কাতার থেকে : ভাগ্যের অন্বেষণে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমাচ্ছেন লক্ষ বাংলাদেশি। তবে বিদেশ পাড়ি দিতে গিয়ে ভিসা প্রতারনার শিকার হয়ে ভুগছেন অনেকে। উচ্চমূল্যে ভিসা কিনতে গিয়ে অনেকে আবার বিষয় সম্পত্তি নিলামে তুলে দিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন। বিদেশে যাবার উত্তেজনায় সঠিক খবরাখবর নিতে ভুলে যান ফলে সহজেই মানুষ প্রতারণার ফাঁদে পড়েন। কাতারে ভিসা প্রতারণার শিকার এমন ভুক্তভোগী কয়েকজন বাংলাদেশি যুবকের সাথে সেদিন কথা হচ্ছিল। ওরা ঢাকার একটি ট্রাভেল এজেন্সির কাছ থেকে ভিসা যোগাড় করে। মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে কাতার পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রথমে তাদের কাছ থেকে দেড় লক্ষ টাকা করে নেয়া হয়। কিন্তু টাকা দেয়ার পর মাস পেরিয়ে যাবার পরও কাতারের টিকেট তাদের মেলেনা। অবশেষে টিকিট পাবার পর কাতার যাবার আগে আরও দেড় লক্ষ টাকা করে দাবী করে ট্রাভেল এজেন্ট। ভিসার জন্য এতা টাকা ব্যয় করে কাতারে এসে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে ওরা। কাতার আগমনের তিন সপ্তাহের মাথায় একটি লেবানীজ কোম্পানীতে রাজমিস্ত্রি হিসাবে তারা কাজ শুরু করে। কিন্তু তিন মাস পরও তাদের আইডি কার্ড মেলেনা। আর আইডি কার্ড না থাকাতে কোম্পানী তাদের বেতন দিতে অস্বীকৃতি জানায়। অবশেষে বেতনের জন্য মামলা করার কথা বললে কোম্পানী বকেয়া বেতন দিয়ে দেয়। কিন্তু এরপর যা ঘটবে সেজন্য কেউ প্রস্তুত ছিলনা। তাদের ভিসার মেয়াদ শেষ তাই এখন দেশে ফিরে যেতে হবে। তিন লক্ষ টাকা খরচ এসে এমন বিপাকে পড়বে তারা ভাবেনি কখনো।

ওয়ার্ক ভিসা দিয়ে তাদের কাতারে পাঠানোর বন্দোবস্ত করা হলেও ঢাকা এয়ারপোর্টে চেক-ইন করতে আসার পরই তারা জানতে পারে আসলে এক মাসের বিজনেস ভিসা নিয়েই তারা কাতার যাচ্ছে। তখন বাড়ী যে ফিরে যাবে সেই পথ আর খোলা নেই। বিমান বন্দরে তাদের আশ^াস দেয়া হয়, কাতারে আসার পর খুব সহসা দুই বছরের ওয়ার্ক ভিসা দেয়া হবে। কিন্তু মাস গড়িয়ে গেলেও কাতারের বাংলাদেশি যে দালাল দোহা বিমান বন্দরে এসেছিলো তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়না। অবশেষে উপায়ন্তর না দেখে ওই তিন যুবক কাতারস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম বিভাগে অভিযোগ করে। দূতাবাসের কর্মকর্তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তড়িৎ ব্যবস্থা নেন। বাংলাদেশি দালালকে দূতাবাসে ডেকে এনে ওই তিন যুবকের পওনা মিটিয়ে দিতে চাপ দেয়া হয়। পরবর্তীতে দূতাবাস ওদের দেশে ফিরে যাবার জন্য এক্সিট পারমিটের ব্যবস্থা করে এবং আর্থিক সহযোগীতাও প্রদান করে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতো বাংলাদেশ দূতাবাস প্রবাসীদের সমস্যা নিয়ে যথেষ্ট আন্তরিক নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে কাতারের বাংলাদেশ দূতাবাস এখন মনে হচ্ছে এর ব্যতিক্রম।

জানা যায়, ভিসার দালাল-চক্র বিজনেস ভিসাকে ফটোশপের কারুকাজ দিয়ে ওয়ার্ক ভিসাতে রুপান্তরিত করে ক্লিয়ারেন্সের জন্য বাংলাদেশের মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। যদিও ভিসা নাম্বার দিয়ে কাতারের স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়ের ওয়োসাইটে গিয়ে খুব সহজেই ভিসা আসল কি নকল তা যাচাই করা যায়। কিন্তু পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ভিসা যাচাই করা সম্ভব হচ্ছেনা। ফলে ভ’য়া ভিসা নিয়ে হাজারো মানুষ লোভী দালালদের চক্রান্তের শিকার হচ্ছে। অনেকে কাতারে আসার পর কাজ পাচ্ছেনা, অনেকের আবার প্রতিশ্রুত কোম্পানী কিংবা কফিলেরও দেখা মিলছেনা। এসব কারনে অনেক বাংলাদেশি এখন কাতারের জেলে মুক্তির দিন গুনছেন। আশা করছি, এ ব্যাপারে বাংলাদেশের শ্রম মন্ত্রণালয় যথাথথ ব্যবস্থা নেবেন।
উল্লেখ্য, আমাদের প্রতিবেশী দেশ যেমন শ্রীলংকা, নেপাল, পাকিস্তান, ও ভারত থেকে একজন শ্রমিক আসতে যে খরচ হয় তার তুলনায় একজন বাংলাদেশিকে বহুগুন বেশী অর্থ ব্যয় করতে হয়। যা তিন থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত গড়িয়ে যায়। একাধিক মধ্যস্বত্ব ভোগীদের চাহিদা পূরন করতেই এতো টাকা গুনতে হয়। ভিসার মাধ্যম যত বেশী হয় ভিসার দামও তত বেড়ে যায়। মূলতঃ দু’ভাবে ভিসা যোগাড় করা যায়- সরাসরি কোম্পানী থেকে কিংবা এজেন্ট/দালালের মাধ্যমে। কোম্পানী সাধারনতঃ বিনামূল্যে ভিসা দিয়ে থাকে। কিন্তু কোম্পানী ভিসার ক্ষেত্রে যা হয় তা হলো, কোম্পানী ম্যানেজার কিংবা কন্ট্রাক্টর যে ভিসা পান তা ফ্রি হলেও তারা মুনাফার জন্য কোনো রিক্রুটিং এজেন্ট, মাধ্যম কিংবা দালালের কাছে ভিসা বিক্রি করে দেন। সেই ভিসা যখন বিভিন্ন হাত ঘুরে একজন শ্রমিকের হাতে আসে, তখন সেটার দাম সব মিলিয়ে ২০ থেকে ৩০ হাজার রিয়াল পর্যন্ত এসে দাঁড়ায়।
মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানী হচ্ছে একটি লোভনীয় ব্যবসা। কাতারে বহু বাংলাদেশী কোম্পানী এখন জনশক্তি রপ্তানীর ব্যবসা করছে। বড় বড় কন্ট্রাক্টিং কোম্পানীতে তাদের প্রজেক্টের জন্য হাজারো শ্রমিকের দরকার হয়। রিক্রুুটম্যান্ট কোম্পানীগুলো ভিসার জন্য এসব কোম্পানীর এইচআর ডিপার্টমেন্টে ধর্ণা দেয়। অনেক সময় কোম্পানীর লোভী এইচআর ম্যানেজার কিংবা কর্মচারী মোটা অঙ্কের বিনিময়ে কোম্পানীর ডিমান্ড লিষ্টের ভিসাগুলো রিক্রুটমেন্ট এজেন্টদের কাছে বিক্রি করে দেয়। রিক্রুটম্যান্ট এজেন্ট তখন নিজেদের মুনাফা রেখে চড়া দামে ভিসা বিক্রি করে।

কাতার সহ অন্যান্য আরব দেশে প্রতারণার একটি অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে ফ্রি ভিসা। অনেকের কাছে ফ্রি ভিসার মানে হচ্ছে চট-জলদি অর্থ উপার্জনের উপায়। কিন্তু ফ্রি ভিসা নামের এই সোনার হরিন ধরতে না পেয়ে সর্বশান্ত হচ্ছেন অনেকে। ফ্রি ভিসা বলতে যে কিছু নেই এই বিষয়টি দেশ থেকে প্রবাস পাড়ি দিতে ইচ্ছুক অনেকের কাছেই পরিস্কার নয়। বাংলাদেশী দালাল এবং ভিসা ব্যবসায়ীদের পাল্লায় পড়ে অনেক হতভাগা শ্রমিক পাচ্ছেনা তাদের ন্যায্য মজুরী, কেউ কেউ দিন কাটছেন অনাহারে।
ফ্রি ভিসাটা আসলেই কি তা এখন খুলে বলছি। কাতারে কেউ কাজ করতে আসতে চাইলে তার একজন স্পন্সর বা কফিলের দরকার হয়। সেই কফিল কোনো কোম্পানী কিংবা একজন ব্যাক্তিও হতে পারে। ফ্রি ভিসার মানে হলো ভিসাধারীকে মালিকের বা স্পন্সরের কাজ করতে হবেনা। সে তার ইচ্ছে মতো বাইরে কাজ করতে পারবে। একজন কফিল বা স্পন্সর, সরকারের কাছ থেকে তার কোম্পানী, বাড়ীর বা বাগানের কাজ করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষ আনার অনুমতি পায়। অনেকে তার মধ্যে কিছু সংখ্যক মানুষ দিয়ে নিজের কাজ চালিয়ে বাকী মানুষকে অর্থের বিনিময়ে বাইরে কাজ করার অনুমতি দেয়। এভাবে মূলতঃ কফিল কিছু টাকা আয় করলেও এ ধরনের কফিলের সংখ্যা খুব কম। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কফিলের লোভী কর্মচারীরা কফিলের অজান্তে ফ্রি ভিসার নামে টাকা কামিয়ে যাচ্ছে। মনে রাখতে হবে, ফ্রি ভিসা নামের প্রক্রিয়াটি আইনগতভাবে বৈধ নয়। ধরা পড়লে কফিলের জরিমান আঠাশ হাজার আর কর্মচারীর বারো হাজার রিয়াল। ফ্রি ভিসার নাম শুনে অনেকে প্রলুব্ধ হন এবং ভাবেন, এতো টাকা খরচ করে বিদেশ এসেছি যখন, বাইরে বেশী বেশী কাজ করে খুব তাড়াতাড়ি ভালো কামাই করা যাবে। ফলে এই ধরনের ভিসার দাম অনেক বেশী। কিছু কিছু বাংলাদেশী ফ্রি ভিসায় কাজ করে সফল হলেও অনেকে চরম ব্যর্থ হয়ে ভুগছেন।
যে সব বাংলাদেশি রিক্রটিং/ট্রাভেল এজেন্ট, ব্যবসায়ী বা মাধ্যম ভিসা নিয়ে কাজ করছেন, তারা চাইলে ভিসার মূল্য অনেক কমানো যায়। এজন্য প্রয়োজন একটু আনন্তরিকতা, মহমর্মিতা এবং অত্যধিক লাভ করার মানসিকতা বর্জন। জনবল বাড়িয়ে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যান ও শ্রম কল্যান মন্ত্রণালয় এই বিষয়টির দিকে নজর দিলে মানুষের ভোগান্তি কমবে আর অনেক বেশী মানুষ প্রবাসে যাবার সুযোগ পাবে।

LEAVE A REPLY