চরিত্রবান সন্তান গঠনের জন্য সুস্থ পারিবারিক পরিবেশ অপরিহার্য

210

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সাল্লাম বলেছেন, ‘প্রত্যেক সন্তানই ফিৎরাতের (দ্বীন বা সত্য কবুল করার যোগ্যতা) ওপর জন্ম গ্রহণ করে থাকে। অতঃপর তার বাবা-মা (নিজেদের বর্তমান চরিত্র দ্বারা) তাকে ইহুদি বা খ্রিষ্টান করে দেয় অথবা অগ্নি উপাসক করে দেয়।’ মানব শিশু জন্ম গ্রহণ করার পর যাদের পরিবেষ্টনে আবদ্ব থাকে সেটি সে শিশুর পরিবেশ বলা হয়। ছোট এ গণ্ডি বা বেষ্টনীর প্রধান দুইজন সদস্য হলো বাবা ও মা, যাকে আমরা পরিবার বলে থাকি। একটু ব্যাপক আকারে বলতে গেলে এর সাথে দাদা-দাদি, চাচা ও ফুপিকেও সদস্য হিসেবে যোগ করতে পারি। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তার পরিবেশেরও সম্প্রসারণ ঘটে। পরিবেশের প্রভাব সম্পর্কে সমাজ ও মনেবিজ্ঞানীরা ব্যাপক গবেষণা ও আলোচনা করেছেন। রাসূল সা:-এর উল্লিখিত হাদিসখানির প্রতি গভীর মনোযোগ নিবদ্ধ করলে বুঝা যায় যে, তিনি কত বড় একজন পরিবেশবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী ছিলেন। পরিবেশ মানবশিশুর বিভিন্নমুখী আচরণ, ব্যবহার ও দোষ-গুণের ওপর কার্যকরী প্রভাব বিস্তার করে। উল্লিখিত হাদিসে ফিৎরাত বলতে দ্বীন বা সত্য ও ন্যায় তথা ইসলামকে কবুল করার যোগ্যতা ও মানসিকতাকে বুঝানো হয়েছে। সব শিশুই এ যোগ্যতা নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে। যে পরিবেশে বা পরিবারে সে জন্ম গ্রহণ করেছে সেটি যদি তার ফিৎরাতের অনুকূল হয়, তবে সে সত্য ও ন্যায়ের ওপর টিকে থেকে তার সুকুমার বৃত্তিগুলোকে সুচারুরূপে প্রস্ফুটিত করতে পারে। আর পরিবেশটি যদি বিপরীতমুখী হয় তবে তার চরিত্র বিপরীতমুখী ধাঁচেই গড়ে উঠবে।
পরিবার হলো একটি শিশুর জীবন গড়ার প্রাথমিক পাঠশালা। এ পাঠশালার পাঠ্য তালিকায় যে ধরনের বই সিলেকশন করা হবে, শিশুর জীবনের ভিত রচিত হবে সে সিলেবাসেরই ওপর। এ জন্য পরিবারের শক্তিশালী দুইজন সদস্য বাবা ও মায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। বাবা-মা যে ধরনের আচরণ, কথাবার্তা ও কাজকর্ম করেন, ছেলেমেয়ে সেসব অনুসরণ করতে শেখে। ছেলেমেয়েরা তাদের জীবনের মডেল হিসেবে পিতামাতাকে গ্রহণ করে থাকে। তাই অনুকরণ প্রিয় শিশুর বাবা ও মা যদি ব্যক্তিগতভাবে সৎ, আল্লাহভীরু ও ইসলামি অনুশাসনের পূর্ণ অনুসারী হন এবং পারিবারিক পর্যায়ে আল্লাহ-প্রদত্ত ও রাসূল সা: প্রদর্শিত পন্থায় পরিবেশকে গড়ে তোলেন, তাহলে তাদের সন্তানেরাও সেভাবেই গড়ে উঠবে। ছেলেমেয়েদের নৈতিক চরিত্র গঠন করা বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের মৌলিক অধিকার। এ অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করা সুস্পষ্ট জুলুম হিসেবে বিবেচিত হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমাদের নিজেদের ও পরিবার পরিজনকে জাহান্নাম থেকে রা করো।’ (আল-কুরআন) রাসূলে করিম সা: বলেছেন, ‘সুন্দর নৈতিক চরিত্র ও শিষ্টাচার শিা দেয়ার চাইতে উত্তম কিছুই মা-বাবা সন্তানদের দান করতে পারে না।’(তিরমিযি) আবু দাউদে বর্ণিত যে, হজরত রাসূলে করিম সা: বলেছেন, ‘কোনো বালকের সাত বছর বয়স হলেই তাকে নামাজের আদেশ দাও। আর ১০ বছর বয়স হলে সে জন্য প্রহার করো ও বিছানা আলাদা করে দাও।’ প্রত্য করুন আল-কুরআনের সুরা লোকমানে একজন আদর্শ বাবা তার ছেলেকে কিভাবে উপদেশ দিচ্ছে,‘স্মরণ করো যখন লোকমান নিজের ছেলেকে উপদেশ দিচ্ছিল, সে বলল ‘হে পুত্র ! আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করো না। যথার্থই শিরক অনেক বড় জুলুম।’(সুরা লোকমান : ১৩)
পান্তরে এ দুইজন যদি বিকৃত স্বভাব, কুরুচি মনের অধিকারী হন, আধুনিক ও প্রগতিবাদী সাজার অভিপ্রায় নিয়ে পাশ্চাত্যের উচ্ছৃঙ্খল আচার-আচরণ এবং কথাবার্তা ব্যক্তিগত ও পরিবারিক পরিসরে চালু করেন, তবে তাদের পরিবারটি পশুর খোয়াড়ে পরিণত হবে। সেখানে শ্রদ্ধাবোধ, লজ্জা-শরম, প্রেম-প্রীতি ও ভালোবাসার পরিবর্তে বেয়াদবি, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা ও উচ্ছৃঙ্খলতা ব্যাপক হারে চালু হবে।
রাসূল সা: বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না। যে ব্যক্তি বাবা-মায়ের অবাধ্য, দায়ুস এবং পুরুষসুলভ আচরণকারী নারী। এখানে দায়ুস বলতে বুঝানো হয়েছে পরিবারের মধ্যে অশ্লীলতা ও পাপাচারের প্রশ্রয় দাতাকে। এটিকে ইমাম অজজাহাবি তাঁর ‘কিতাবুল কাবায়ের’ গ্রন্থে কবিরা গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিরমিজি শরিফে বর্ণিত, রাসূল সা: বলেছেন, নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতা কোনো বস্তুর কদর্যতাই বৃদ্ধি করে। আর লজ্জা কোনো জিনিসের সৌন্দর্যই বৃদ্ধি করে।’
আবদুল্লাহ ইবনে আমের রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, ‘ তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম চরিত্রের ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ। (রাবি বলেন), নবী সা: অশ্লীলভাষীও ছিলেন না এবং অশ্লীলতার ভানও করতেন না।’ (তিরমিযি)
আল কুরআনে বাবা-মায়ের এত বেশি সম্মান, ইজ্জত ও অধিকার দান করার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? আমি মনে করি, বহুবিদ কারণের মধ্যে অন্যতম কারণ হলো, যেহেতু বাবা-মা অত্যন্ত পরিশ্রম করে নিজের সন্তানদেরকে নৈতিকতাবোধসম্পন্ন, সুচরিত্রবান ও সামাজিক দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তোলেন। এবং এর পেছনে বাবা-মায়ের অবদানই সবচেয়ে বেশি। যার দরুন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর আলোচনার পরপরই বাবা-মায়ের কথা বলেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন : ‘তোমরা আল্লাহর দাসত্ব করো। তার সাথে কাউকে শরিক কোরো না, আর বাবা-মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার কোরো।’ (সুরা নিসা : ৩৬) বুখারি শরিফে হজরত আবু হোরায়রা রা: থেকে বর্ণিত এক ব্যক্তি রাসূলে করিমকে সা: আরজ করেনÑ হে আল্লাহর রাসূল! আমার ভালো ব্যবহার পাওয়ার সবচেয়ে বেশি অধিকারী কে? তিনি বললেন তোমার মা। এভাবে তিনবার মায়ের কথা বলার পর চতুর্থবার বাবার কথা বলেন। বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করাকে নবী সা: কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এ ছাড়া আল-কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও রাসূলের হাদিসে বাবা-মায়াকে অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করে সম্মানিত করা হয়েছে।

LEAVE A REPLY