পর্তুগালে অভিবাসন: বৈধ হওয়াটা শুধুই সময়ের ব্যাপার !

88

আজকাল সকাল বিকেল লিসবনে বাংলা অধ্যুষিত এলাকায় আসা-যাওয়ার পথে, বিভিন্ন মানুষের সাথে দেখা হলে মনটা খুশিতে ভরে  ওঠে। অনেকে ফোন করে জানিয়েছে, ম্যাসেজ দিয়েও অনেকে জানিয়েছেন, আর যারা বলতে না পেরে দেশে চলে গেছেন তারা আবার ইনবক্সে বিয়ের দাওয়াত পাঠিয়েছেন। নির্দ্বিধায় এটি আমাদের জন্য একটি মহা আনন্দের বিষয়। এটি একটি খুশির সংবাদ।

আমরা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছি আপনাদের খুশি করার জন্য। হয়তো অর্থনৈতিক সাহায্য করতে পারিনি, তবে আপনাদের অস্থির হতাশাগ্রস্ত সময়টাতে পাশে থেকে একাত্মতা প্রকাশ করেছি। এখনো যে সব সাদা পাসপোর্টধারী ভাইয়েরা কাগজ পাননি- তাদের বলছি, আর একটু সবুর করুন, ইনশাআল্লাহ্‌ আপনারাও একটা সময় কাগজ পাবেন। এখন ডকুমেন্ট পাওয়াটা শুধুই সময়ের ব্যাপার।

পর্তুগালের আন-ডকুমেন্টেড অভিবাসীরা যে সমস্যায় ছিল ও আমরা যা করেছি:
পর্তুগাল ইউরোপের মধ্যে একটি গরীব দেশ। ১৯৯৩ সাল থেকে কোন না কোনভাবে পর্তুগালে মানুষ বৈধ ডকুমেন্ট অর্জন করে, আজ প্রায় ১৫ হাজার বাংলাদেশী পর্তুগীজ সিটিজেন। গত ২০০৭ থেকে আর্টিকেল ৮৮ এর মাধ্যমে এ দেশে বহু মানুষ লিগ্যালভাবে বসবাস করছে। সেই সুবাদে ২০১৫ সালে গ্রেট ব্রিটেনের ব্রেক্সিট নির্বাচনের পরে আমাদের কোমলমতি হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী অন্য কোন উপায় না পেয়ে, পর্তুগালে পাড়ি জমায়। তারা ব্রিটিশদের ইংরেজি চালের মারপ্যাচে পড়ে সহায় সম্বল হারিয়ে যখন পর্তুগালে আসে, তখন পর্তুগালের এক শ্রেণীর লোভী মানুষ তাদেরকে শিয়ালের খাঁচায় মুরগীর মতো করে ফায়দা লুটে। একই সময় পর্তুগীজ নতুন সরকার ডিজিটাল পর্তুগাল কায়েমের লক্ষ্যে পুরনো জঞ্জাল সাফ করার মানসে বিগত দিনের সকল নিয়ম-কানুন পরিবর্তনের লক্ষ্যে ইমিগ্রেশনের সকল কাজ স্থগিত করে দেয়। এ যেন মরার উপর খারার ঘা।

২০১৫ থেকে ২০১৬ এর মাঝামাঝি প্রায় ৫/৬ হাজার লোক ছোট্ট বাংলা জোন মারতিম মনিজে এসে আবিস্কার করে নতুন একখণ্ড বাংলাদেশ- যেখানে থাকার জায়গা নেই, খাবারের বন্দোবস্ত নেই, যেদিকে তাকানো যায় শুধু অবৈধ মানুষ আর মানুষ। পরিচিত জন, উকিল, একাউন্ট্যান্ট, দোভাষী, আঞ্চলিক নেতা, রাজনৈতিক নেতা, দেশী ভাই সব মিলে যেখানেই যায়, সেখানেই কুমিরের মতো স্বার্থান্বেষী চোখ ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে মায়া কান্নায়।

এমতাবস্থায়, পর্তুগালে ইমিগ্রান্টদের সংগঠন ‘সলিম’ ২৭ শে অক্টোবর ২০১৬, প্রায় ত্রিশ হাজার অবৈধ অভিবাসীর বৈধতার দাবীতে পর্তুগালের জাতীয় পার্লামেন্ট ঘেরাও কর্মসূচী পালন করে। লিসবনের রেডিও, টেলিভিশন ও বিভিন্ন পত্র পত্রিকার সাংবাদিকরা এই খবর প্রকাশ করলে দেশব্যাপী সাড়া জাগে ও সরকারের টনক নড়ে। ২০১৬ এর ১৩ই নভেম্বর প্রায় দশ হাজার লোকের বিশাল সমাবেশ ইমিগ্রান্ট সলিডারিটির নেতৃত্বে লিসবনে গণ সমাবেশের মাধ্যমে অভিবাসী অধিকারের গুরুত্বপূর্ণ ৫ দফা দাবী ঘোষণা করা হয় এবং তারই সূত্র ধরে পর্তুগালের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, জুডিশিয়াল ন্যায়পাল, সংসদ সদস্য, মাননীয় স্পীকার, মন্ত্রী পরিষদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, ইমিগ্রেশন দপ্তরসহ বিভিন্ন সেক্টরে ইমিগ্রান্ট সলিডারিটির ধারাবাহিক আলোচনা চলতে থাকে।

১২ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পীকার জর্জ লাকাও, ১৪ ডিসেম্বর জুডিশিয়াল ন্যায়পাল হেনরিক আন্তুনেস, ১৫ ডিসেম্বর বামপন্থী সংসদ সদস্য সান্দ্রা কুইনা, ১৫ ডিসেম্বর একই দিনে রাজনৈতিক দল গ্রীন পার্টি সচিব এমা গোমেজ, ১৬ ডিসেম্বর নাগরিক সমন্বয় মন্ত্রী পরিষদ সচিব কাটারিনা মারসেলো, ও এই বছর ১৩ জানুয়ারী পর্তুগালের রাষ্ট্রপতির নিকট অবৈধ অভিবাসীদের সমস্যার সমাধান করার জন্য সাহায্য প্রার্থনা করেন।
সর্বশেষ গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ স্বয়ং সরকারী দল ইলিগ্যাল ইমিগ্রান্টদের নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়।
সরকারী দলের লিসবন মহানগরীর সভাপতি দুয়ারতে কুরদেইরো ও দলের সিনিয়র জাতীয় সেক্রেটারী জোসে লেইতাও, অধ্যাপক পিনা পিরেস ও সুজানা রামস এর সমন্বয়ে মহানগরী অফিসে লিসবনের বিভিন্ন ইমিগ্রান্ট সংগঠনের দলীয় প্রতিনিধিদের এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ইমিগ্রান্টদের পক্ষে জোর দাবী তুলে বলা হয়, সরকার যেন অনতিবিলম্বে অসহায় ইমিগ্রান্টদের বৈধ কাগজের জন্য সহায়তা করে।

উপস্থিত নেতৃবৃন্দ আশ্বাস প্রদান করে বলেন ‘আমাদের দলের মাধ্যমেই ১৯৯৩, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৭ সালের ইমিগ্রান্ট বান্ধব আইন তৈরি হয়, যে আইনের ভেলা আজ অবধি ভাসতে থাকে। তাই ইমিগ্রান্টদের পক্ষে অন্য কোন দল আসুক কিংবা ইমিগ্রান্ট বান্ধব হোক, তা আমরা অবশ্যই চাইবো না। এজন্য আমরা আজকের এই মেসেজ উপরের পর্যায়ে পৌঁছাতে চেষ্টা করবো, যাতে তড়িৎ সিদ্দান্ত নেয়া যেতে পারে।’ এই দিনই আমি সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রিকে বিনয়ের সাথে বলি, যাতে করে দ্রুত আমাদের লোকদের কার্ড ইস্যু করে এবং তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন।

পর্তুগালে আনুমানিক প্রায় ত্রিশ হাজার বাংলাদেশী গত তিন দশকে এসেছেন। এদের মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার পর্তুগীজ সিটিজেনধারী হয়ে নিজেদের ব্যবসা, বাচ্চাদের স্কুল ও অন্যান্য সুবিধা অর্জনে গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। উল্লেখযোগ্য হারে বাংলাদেশী পর্তুগীজ সিটিজেনধারী পরিবারগুলো ইংল্যান্ড আর যুবকরা সুইজারল্যান্ডে বেশী অবস্থান করছেন।

সরকার তাদের লাভ চায়, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা না হলে কোন সরকারই জনগনের স্বার্থ দেখে না। লিসবন বাংলাদেশ এমব্যাসির প্রাক্তন মান্যবর এম্বাসেডর ইমতিয়াজ আহমেদ সাহেব প্রশাসনিক পর্যায়ে আলাপ করে আমাদের বলেছিলেন-
‘এদেশ কেন আমাদের বৈধ ডকুমেন্ট দিবেন? সরকারী প্রশাসনের সকল পর্যায়ের লোক জানেন যে, আমাদের বাংলাদেশীরা এই দেশে থাকে না, কোন ধরনের বড় ইনভেস্ট করে না, তারা আসে ইলিগ্যাল হয়ে আর পাসপোর্ট নিয়ে চলে যায় অন্য দেশে। তাহলে বিনা স্বার্থে কেন তাদের বৈধতা দিয়ে পাসপোর্টের ব্যবস্থা করবেন এই দেশের সরকার? জাতীয় স্বার্থ কি?’

তারপরও আমরা থেমে নেই। আমরা সকল অবৈধ মানুষের পক্ষে আমাদের আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। নিচের ১৩ টি দাবীর প্রতি দৃষ্টি রেখে আমরা আজ অবদি আন্দোলন চালিয়ে রেখেছি ও চালিয়ে যাবো ইনশাআল্লাহ্‌।

প্রতিটি বিভাগে সকলের জন্য বৈধ ডকুমেন্টের জোর দাবী জানানো হয়। অভিবাসীদের বৈষম্য না রেখে, সকল ক্ষেত্রে সম-অধিকারের কথা হয়। ৩২০০টি প্রসেস জমা পড়ে আছে যাদের বৈধ ফি ও আঙ্গুলের ছাপ দেয়া হয়েছে অথচ এখনো রেসিডেন্ট কার্ড ইস্যু করা হয় নাই। অনতিবিলম্বে তাদের রেসিডেন্ট কার্ড ইস্যু করার তাগিদ প্রদান করা হয়। সেগুরান্সা সোসিয়াল নম্বর, ফিন্যান্স নম্বর, হেলথ কার্ড নম্বর না থাকলে মানুষের মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়, তাই মানবিক দিক বিবেচনা করে কর্মজীবী সকলের জন্য এই নম্বরগুলো ব্যবস্থার দাবী তোলা হয়।

ইদানিং যেভাবে এস ই এফ থেকে ফোন করে মারকাসাও বাতিল করা হয় অথবা ৬ মাস পরে যোগাযোগ করতে বলা হয়, তা নিতান্ত অমানবিক বলে অভিহিত করা হয়। এর কারণ দর্শানোর কথা জানানো হয়।অভিবাসীরা অবৈধ হলে, তাদের সন্তান জন্ম নিলে তাকে ডকুমেন্ট দেয়া হয় না। বলা হয়- স্কুলে ভর্তি হলে জাতীয়তার জন্য আবেদন করতে পারবে। কিন্ত কেন? কোন অবস্থায় এই বৈষম্য মেনে নেয়া যায় না বলে দাবী করা হয়। অবৈধ অভিবাসীদের কাজের চুক্তিপত্রের মাধ্যমে তাদের স্বাস্থ্য সেবার নিশ্চয়তার দাবী জানানো হয়। রেসিডেন্ট কার্ড নবায়নের ক্ষেত্রে ৪৫ দিন পূর্বে জমা দেয়ার নিয়মে যদি কেউ জমা করে তবে এমনও সময় দেখা যায় যে ৬ মাস অতিবাহিত হয় অথচ নবায়ন হয় না। এতে যে ভোগান্তি হয়, তা দূর করার প্রতিবাদ জানানো হয় এবং যথাসময়ে নবায়নের দাবী তোলা হয়।

সক্রিয়ভাবে যখন কোন অভিবাসী চুক্তিপত্রের মাধ্যমে বৈধ কাজ করা সরকারকে নিয়ম মোতাবেক ট্যাক্স প্রদান করে মাসের পর মাস অথচ হঠাৎ করেই ইন্টার্ভিউ দিতে গেলে বলে দেয় ২০ দিনের মধ্যে দেশ ত্যাগ করতে হবে। একবারও চিন্তা করে না যে, এই লোক এই দেশে কাজ করে নিজের জীবিকা অর্জন করে ও সরকারকে ট্যাক্স প্রদান করে, কেন তাকে এই সিদ্ধান্ত দেয়া হবে? সে তো অপরাধ করেনি, কোন ক্রাইম সাথে থাকেনি। এর জোরালো প্রতিবাদ জানানো হয়।

অভিবাসী যে যুবকের জন্ম এই দেশে, লেখাপড়া এই দেশে, সে যদি কোন কারণে আইনগত সমস্যায় জড়িয়ে পড়ে, তবে তাকে রেসিডেন্ট কার্ড নবায়ন করতে দেয়া হয় না। এটা কি বৈষম্য নয়? এরও কড়া প্রতিবাদ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ছাত্র কিংবা ১৮ মাস কাজের পর কর্ম নাই ভাতা নিচ্ছে, এমন অভিবাসীর যদি রেসিডেন্ট কার্ড এর মেয়াদ উত্তীর্ণ হয় আর নবায়ন হতে দেরী হয় তবে তাদের সরকারী ভাতা বন্ধ করে দেয়া হয়। এমতাবস্থায় তারা কোথায় যাবে, কেমন করে থাকা খাওয়া নিশ্চিত হবে তা কি কখনো সরকার ভেবেছে? এর সঠিক সুরাহা কোথায় সেই প্রশ্ন রাখা হয়।

আগামীতে সিটিজেনশীপ আইনে পরিবর্তন আসতে পারে, সেই ব্যাপারে আলোকপাত করা হয় যাতে ঐ আইনে অভিবাসীদের স্বার্থ বিরোধী কোন কিছু না থাকে। বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ে আইনটির গবেষণা চলছে।আর্টিকেল ৮৮, ৮৯, ১২২, ১২৩ নিয়েও ব্যাপক আলোচনা করা হয়, যাতে করে এই আইনগুলো আন্তর্জাতিক মানের হয় এবং অভিবাসী বান্ধব হয় সেই দাবী তোলা হয়।
বিদেশের মাটিতে মানুষের একমাত্র সম্বল একটি বৈধ ডকুমেন্ট। যাদের এই বৈধ ডকুমেন্ট নাই একমাত্র তারাই বুঝে, এটার কত মুল্য। যারা সুদূর বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার টাকা খরচ করে ইউরোপে এসে বছরের পর অপেক্ষা করে আজ বৈধতা লাভ করেছে কিংবা সিটিজেনশীপ অর্জন করেছে, দুঃখের বিষয় তারা এখন ইউরোপের বহুরূপে রুপান্তরিত হয়ে অন্যদের ডকুমেন্টের কী ব্যথা তা অনুভব করতে চায় না বলেই অবৈধদের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি ফেলে। আমার ব্যাক্তিগত অনুররোধ রইলো সকলের প্রতি- ‘আসুন আমরা সকলে এদের সাহায্য করি। সহযোগিতা না পারলে অন্তত যাতে অপকার না করি।’

যদিও প্রায় ৪৯ টি দেশের অভিবাসীদের আনুমানিক ৩০,০০০ অবৈধ অভিবাসী পর্তুগালে বসবাস করছে বলে ইমিগ্রান্ট সলিডারিটির দাবী করি। কিন্তু ৭/৮ টি দেশের প্রতিনিধি ছাড়া আর কাউকেই কোন মিটিং এ আমরা খুঁজে পাইনি। ইমিগ্রান্ট সলিডারিটির সাথে প্রথম থেকে বাংলাদেশীদের পক্ষে কাজ করছি এবং ব্যক্তিগত ও দলীয় সোসিয়ালিস্ট পার্টির মাধ্যমেও সাদা পাসপোর্টধারীদের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। দেখা যাক, কতদূর এগোনো যায়। আইনের বাহিরে আমাদের কিছুই করা সম্ভব নয়। আইনকে সন্মান করে মানবতাকে সামনে এনেই আমাদের কজ করতে হয়। আপনাদের সকলের জীবনে সফলতা আসুক এই দোয়া করি। আপনাদের সফলতা মানেই আমাদের দেশের সফলতা। দেশের সফলতা আসুক, অহরহ স্রষ্টার নিকট সর্বদা এই প্রার্থনা করি, আমীন!

LEAVE A REPLY