মাহে রমজান আমাদেরকে যে বার্তা দিয়ে গেল

184

রমজান ট্রেনিং ও প্রশিক্ষণের মাস। সে প্রশিক্ষণ কাজে লাগাতে হয় সারা বছর। ইসলাম ধর্মের ইবাদতগুলো শুধু অনুষ্ঠানসর্বস্ব নয়। ইবাদত পালনের পাশাপাশি ইবাদতের মধ্যকার দর্শন ও অন্তর্নিহিত শিক্ষানুযায়ী জীবনযাপনের মধ্যেই নিহিত রয়েছে ইবাদত পালনের সার্থকতা। রোজার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো তাকওয়া অর্জন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ঈমানদাররা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের আগের লোকদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া বা পরহেজগারি অর্জন করতে পারো। ’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৩)

রমজান মুসলমানদের জীবনে পরিবর্তন আনার মোক্ষম সুযোগ। তাই রমজানের পর পরিবর্তিত জীবনে ফিরে যাওয়াই রমজানের দাবি। কেননা রোজা নিছকই উপবাস থাকা, পানাহার ও কামাচার বর্জনের নাম নয়। এর বিশেষ তাৎপর্য ও দর্শন রয়েছে। রয়েছে এর দৈহিক, আত্মিক, নৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উপকারিতা। হাকিমুল উম্মত আল্লামা আশরাফ আলী থানভি (রহ.) বলেন, ‘বিশুদ্ধ যুক্তি অনুসারে মানুষের কুপ্রবৃত্তি ও আবেগের ওপর বিবেকের সর্বদা প্রভাব বিস্তার করা উচিত। কিন্তু মানবীয় দুর্বলতার কারণে অনেক সময় বিবেকের ওপর মানুষের আবেগ প্রাধান্য লাভ করে। তাই আত্মশুদ্ধি ও আত্মজাগৃতির জন্য ইসলাম রোজাকে মৌলিক ইবাদতগুলোর অন্তর্ভুক্ত করেছে। রোজা রাখার দ্বারা মানুষের কুপ্রবৃত্তি ও আবেগের ওপর বিবেক পরিপূর্ণভাবে বিজয়ী হয়। এতে তাকওয়ার গুণাবলি অর্জিত হয়। রোজা রাখার মাধ্যমে মানুষের নিজের অক্ষমতা ও অপারগতা এবং আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব ও কুদরতের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। রোজার মাধ্যমে অন্তর্দৃষ্টি খুলে যায়, দূরদর্শনের ধারণা প্রবল হয়। আসবাব ও উপকরণের হাকিকত খুলে যায়। পাশবিকতা ও পশুত্ব অবদমিত হয়। ফেরেশতাদের নৈকট্য লাভ হয়। আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায়ের সুযোগ হয়। অন্তরে মানবিকতা ও সহমর্মিতার বন্যা বয়ে যায়। রোজা দেহ-আত্মার সুস্থতার কারণ। রোজা মানুষের জন্য এক রুহানি খাদ্য, যা পরকালে মানুষের জন্য খাদ্যের কাজ দেবে। সর্বোপরি রোজা আল্লাহর ভালোবাসার অন্যতম নিদর্শন। ’ (আহকামে ইসলাম আকল কি নজর মে. পৃ. ১৪৩-১৪৫, সংক্ষেপিত)

রোজাদারদের উচিত এসব গুণ অর্জনে সচেষ্ট হওয়া। প্রকৃতপক্ষে দুটি বিপরীত বস্তু দেহ ও মনের সমন্বয়ে মানুষের সৃষ্টি। দেহ মাটির তৈরি। আর রুহ বা আত্মা আল্লাহর হুকুম বা নূরের তৈরি। মাটি নিম্নগামী। আর রুহ ঊর্ধ্বগামী। মাটির বৈশিষ্ট্য যখন মানুষের মধ্যে প্রবল হয়, তখন সে মনুষ্যত্বটুকুও হারিয়ে ফেলে। বরং চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট হয়ে যায়। অন্যদিকে আত্মার শক্তি যখন তার মধ্যে প্রবল হয়, তখন সে মারেফতে এলাহি অর্জনে সক্ষম হয়। এমনকি উত্কর্ষের বিচারে ফেরেশতাকুলকেও ছাড়িয়ে যায়। মানুষ পশু নয়, নয়তো ফেরেশতাও। পশুসুলভ গুণ ও ফেরেশতাসুলভ স্বভাবের সমন্বয়ে মানুষের সৃষ্টি। এ দুয়ের দ্বন্দ্বও চিরন্তন। মুসলিম দার্শনিক শাহ ওয়ালী উল্লাহ (রহ.)-এর মতে, ‘যখন প্রবল পশুসুলভ গুণ ফেরেশতাসুলভ গুণ প্রকাশের পথে বাধা দেয়, তখন তাকে গুরুত্ব দিয়ে অবদমিত করা জরুরি। আর পশুসুলভ গুণের প্রাবল্য, উন্নতি ও ক্রমবৃদ্ধি ঘটে পানাহার ও জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে। তাই পশুত্ব অবদমনে এই উপকরণগুলোর সংকোচনের বিকল্প নেই। ’ (হুজ্জাতিল্লাহিল বালিগা, খ. ২, পৃ. ৪৮)

মাহে রমজানের রোজা মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে চলার শিক্ষা দেয়। হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি ও আত্ম-অহংবোধ ভুলে গিয়ে সুখী, সুন্দর ও সমৃদ্ধিশালী সমাজ প্রতিষ্ঠার মাসই হলো মাহে রমজান। রোজা মানুষকে পার্থিব লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, পরচর্চা, পরনিন্দা, মিথ্যাচার, প্রতারণা, অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের আকাঙ্ক্ষা প্রভৃতি থেকে দূরে সরিয়ে রেখে আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়। রোজা মানুষকে আত্মনিয়ন্ত্রণ, মিতাচার, মিতব্যয়িতা ও পারস্পরিক ভালোবাসার শিক্ষা দেয়। রমজানে বিশেষ বিশেষ ইবাদতের বিধান দেওয়া হয়েছে—সিয়াম সাধনা, তারাবি, রোজাদারকে ইফতার করানো, ইতিকাফ, কোরআন তেলাওয়াত, দান-সদকা, সহমর্মিতা প্রকাশ, শবেকদর অন্বেষণ, ওমরাহ পালনসহ বহু ইবাদতের বিধান রয়েছে। এসবের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে সারা বছরই। রমজান জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের মাস, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রমজান মাসের প্রথম রজনীর যখন আগমন ঘটে, তখন শয়তান ও অসৎ জিনগুলোকে বন্দি করা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়, এ মাসে একটি দরজাও খোলা হয় না। জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, এ মাসে তা আর বন্ধ করা হয় না। প্রতি রাতে একজন ঘোষণাকারী এই বলে ঘোষণা দিতে থাকে যে হে সত্কর্মের অনুসন্ধানকারী, তুমি অগ্রসর হও! হে অসৎ কাজের অনুসন্ধানকারী, তুমি থেমে যাও! এ মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে বহু মানুষকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। (বায়হাকি, সুনানে সুগরা, হাদিস : ১৪২৯)

রমজান ইবাদতের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে। কোরআনের সঙ্গে ভালোবাসা স্থাপন করে। হালাল উপার্জনের প্রেরণা দেয় এবং পরিশ্রমের মানসিকতা তৈরি করে। রমজানের এ সর্বব্যাপী শিক্ষার আলোকে সারা বছর নিজের জীবন পরিচালিত করতে না পারলে নিছকই উপবাস থাকা ছাড়া রমজানে আমাদের আর কোনো অর্জন নেই।

বিশিষ্ট আলেম মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব এ প্রসঙ্গে লিখেছেন : এটা বাস্তব যে, যে ব্যক্তি রমজানের হক যত বেশি আদায় করেছে, রমজানের আদবগুলোর প্রতি যত বেশি যত্নবান থেকেছে, সে তার কর্মজীবনে রমজান ও ঈদের প্রভাব ও ক্রিয়া তত বেশি অনুভব করবে। আর যে ব্যক্তি ত্রুটি করেছে সে তার ত্রুটির মাত্রা অনুপাতে প্রভাব ও ক্রিয়ায়ও ত্রুটি উপলব্ধি করবে।

রমজানের সবচেয়ে বড় প্রভাব তাকওয়া, যা বান্দাকে প্রতি মুহূর্তেই রাহনুমা (পথপ্রদর্শন) করে, কল্যাণের দিকে আহ্বান করে, কল্যাণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে এবং অকল্যাণের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে। অকল্যাণ থেকে বিরত থাকার তাগিদ সৃষ্টি করে। তাকওয়ায় পরিপূর্ণ অন্তর নসিহত দ্বারা দ্রুত প্রভাবিত হয় ও সামান্য সতর্ক করার দ্বারা অমঙ্গলের পথ থেকে ফিরে আসে।

আমরা যদি রমজান ও রোজার পুরো হক আদায় না করে থাকি, তাহলে তাকওয়ার সেই বিশেষ স্তর আমাদের অর্জিত হয়নি। তবুও নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। কেননা প্রত্যেক মুমিনের অন্তরে সামান্য পরিমাণে হলেও তাকওয়ার স্ফুলিঙ্গ অবশ্যই থাকে। আর রোজার মাধ্যমে তাতে কিছু না কিছু বৃদ্ধি অবশ্যই ঘটে থাকে। এখন যদি তা সযত্নে লালন করা হয় এবং সে মোতাবেক ধীরে ধীরে আমল করা হয়, তাহলে এ গুণ দৃঢ়তর ও উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হতে থাকবে। গুণাবলি ও যোগ্যতাগুলোর এটাই সহজাত নিয়ম এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টিকারী সৎ গুণাবলির ব্যাপারে এ কথা অধিক সত্য ও অধিক প্রযোজ্য।

এখন যদি অন্তরে কোনো নেক কাজের আগ্রহ সৃষ্টি হয় বা নেক কাজের দিকে অন্তর ধাবিত হয়, তাহলে বুঝতে হবে এটি তাকওয়া ও খোদাভীতির প্রভাব। এর কদর করতে হবে এবং কালবিলম্ব না করে এই আগ্রহ মোতাবেক আমল করতে হবে। তেমনিভাবে কোনো গুনাহর ব্যাপারে যাতে আমরা দুর্ভাগ্যবশত লিপ্ত রয়েছি, যদি অন্তরে ঘৃণা সৃষ্টি হয়, তা পরিহার করার তাগাদা যদি অন্তরে উপলব্ধি হয়, তাহলে বুঝতে হবে এটা অন্তর্নিহিত তাকওয়া ও খোদাভীতির প্রভাব। এর কদর করা এবং সঙ্গে সঙ্গেই সে গুনাহ পরিত্যাগকরত খাঁটি মনে তওবা করে নেওয়া জরুরি। এ ব্যাপারে কালবিলম্ব করা এ জন্য ভয়াবহ যে দুর্বল তাকওয়ার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয় না এবং বারবার অন্তরের এরূপ আগ্রহকে মূল্যায়ন না করলে তা আরো দুর্বল হয়ে যায়, যা একজন মুমিন বান্দার জন্য খুবই দুর্ভাগ্যের বিষয়।

গুনাহ যখনই করা হোক তা গুনাহ। তাই রমজান মাস চলে গেলে গুনাহর কাজে লিপ্ত হওয়া যায়—এই মানসিকতা পরিহার করতে হবে। তা ছাড়া নামাজ রোজার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ফরজ। এটি প্রতিদিনের আমল। ঈমান ও ইসলামের নিদর্শন। যে মুমিন অন্তত এটুকু চিন্তা করবে যে নামাজের মাধ্যমে মাটি দ্বারা সৃজিত এই দুর্বল মানুষ তার সৃষ্টিকর্তা ও মালিকের দরবারে হাজিরা দিতে পারছে, তার প্রিয় প্রেমাষ্পদ রহমান ও রহিমের সঙ্গে কথোপকথনে সক্ষম হচ্ছে, তার পক্ষে নামাজের ব্যাপারে কোনো শিথিলতা প্রদর্শন করা সম্ভব হবে না; বরং অতি দুর্লভ অথচ সহজপ্রাপ্তি ভেবে মনে-প্রাণে নামাজের ব্যাপারে যত্নশীল হবে।

LEAVE A REPLY